পর্যটন শিল্পের অমিত সম্ভাবনার পার্বত্য চট্টগ্রাম, দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখার সুযোগ

শ্যামল রুদ্র, নিজস্ব প্রতিনিধি:

নয়নাভিরাম প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে ভরপুর আমাদের দেশের এক দশমাংশ এলাকা নিয়ে পাহাড়-নদী-অরণ্য বেষ্টিত নৈসর্গিক মনোরম দৃশ্য ঘেরা বহুমাত্রিক আকর্ষণীয় সবুজ বনভূমি খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও রাঙ্গামাটি নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর দৃষ্টিনন্দন বৈচিত্রপূর্ণ সংস্কৃতি কৃষ্টি আচার-অনুষ্ঠানে সমৃদ্ধ বিচিত্র জীবন ধারা, পাহাড়ি স্বচ্ছ জলের লেক, ইতিহাস ও ঐতিহ্যময় স্থান, বিভিন্ন উৎসব-পার্বণ এবং বুনো পশু ও পাখ-পাখালির মিষ্টি কলরবে মুখরিত অভায়রণ্যে সমৃদ্ধ পার্বত্যাঞ্চলে রয়েছে পর্যটন শিল্পের অমিত সম্ভাবনা। দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য অবদান রাখার সুযোগ রয়েছে পর্যটন শিল্প থেকে। কিন্তু নানামুখী সমস্যায় বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল এই শিল্প এখানে কাঙ্খিত অবস্থান থেকে অনেক দূরে। বিশ্বায়নের যুগে পুরো পৃথিবীময় যে পরিবর্তন সে প্রেক্ষাপটে পর্যটনের ক্ষেত্রে যতটা অগ্রগতি হওয়ার কথা রাজনৈতিক ও আর্থ সামাজিক অবস্থার কারণে ততটা অগ্রগতি হয়নি এখানে। তবে আশার কথা গত কয়েকবছরে পার্বত্যাঞ্চলে পর্যটন শিল্প পূর্বের তুলনায় কিছুটা হলেও এগিয়েছে। নতুন নতুন পর্যটন ক্ষেত্র গড়ে ওঠায় ভ্রমণপিপাসুদের সংখ্যাও বাড়ছে ক্রমান্বয়ে। এ ধারা অব্যাহত রাখতে পর্যটনবান্ধব নীতি ও পরিকল্পনা দরকার। পাহাড়াঞ্চলের উন্নয়নে গঠিত পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, পার্বত্য জেলা পরিষদসহ পর্যটন কর্পোরেশন ও সংশ্লিষ্ট বিভাগ এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারে। এ খাতকে এগিয়ে নিতে পর্যটন বিষয়ক নিয়মিত প্রকাশনা ও পর্যটন স্থাপনার সংখ্যা বাড়িয়ে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের সামনে অত্যন্ত আকর্ষনীয় ভাবে তুলে ধরা যায়। রাঙ্গামাটির সাংবাদিক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক ইয়াছিন রানা সোহেল প্রসঙ্গক্রমে বলেন, সচিব নব বিক্রম কিশোর ত্রিপুরা পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেওয়ার পর পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে পার্বত্যাঞ্চলের সৌন্দর্য ও সম্ভাবনাকে দেশ-বিদেশে তুলে ধরতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছেন।

গত ১৭ অক্টোবর রাঙ্গামাটিতে এক অনুষ্ঠানে র‌্যাব প্রধান বেনজির আহমেদ জানান, গত দশ বছরে পাহাড়ের উন্নয়নে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে নয় হাজার কোটি টাকা বরাদ্ধ দেওয়া হয়েছে। এ অর্থের কিছু অংশও যদি পর্যটন খাতের উৎকর্ষ সাধনে সুপরিকল্পিত ও দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপ নিয়ে ব্যয় হয় তাহলে পর্যটন শিল্পে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব। বর্তমান সরকার অবশ্য এ বিষয়ে যথেষ্ঠ আন্তরিক। পাহাড়ে পর্যটন শিল্প বিকাশে কাজ করছে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ। ২০, অক্টোবর বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির উপবন ও জারুলিয়াছড়ি পর্যটন স্পট দুটি পরিদর্শন করেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট মো.মাহবুব আলী। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ভারতের শিমলার চেয়েও আকর্ষনীয় নাইক্ষ্যংছড়ি পাহাড়ের মনোলোভা প্রাকৃতিক দৃশ্য।

জাতিসংঘের বিশ্ব পর্যটন সংস্থা (ইউএনডব্লিউটিও) ১৯৮০ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী ২৭, সেপ্টেম্বর বিশ্বপর্যটন দিবস পালনের উদ্যোগ নেয়। এবারের (২০১৯ সাল) প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল “ভবিষ্যতের উন্নয়নে কাজের সুযোগ পর্যটনে”। এই দিবসে মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এক বাণীতে বলেন,“সুপরিকল্পনা, দক্ষ সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্তকরণের মাধ্যমে দেশের পর্যটন শিল্প উন্নতির শিখরে পৌঁছাতে সক্ষম হবে”।

পরিব্রাজক অধ্যাপক ফিরোজ আহমেদের ভাষ্য মতে, পার্বত্য এলাকায় অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধার অভাব পর্যটন শিল্প বিকাশে বড় ধরনের দুর্বলতা। পর্যটন স্পটগুলোতে আধুনিক মানের হোটেল-মোটেল নেই। এতে পর্যটকরা ঘুরতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি আঁকা-বাঁকা রাস্তা অত্যন্ত সংকীর্ণ ও অনুন্নত। এটি যোগাযোগ ব্যবস্থায় সৃষ্টি হচ্ছে প্রতিবন্ধকতা। দক্ষ গাইড ও গাইড বুক কিংবা মার্জিত রুচির জনশক্তির অভাব লক্ষ্য করা যায়। উদার মানসিক দৃষ্টিভঙ্গির অভাবে অনেকসময় পর্যটকেরা দুর্ব্যবহার ও তাচ্ছিল্যের শিকার হন। যা পর্যটন শিল্পে নেতীবাচক প্রভাব পড়ে, ইমেজ সঙ্কট দেখা দেয়। তাই জরুরি ভাবে অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি ট্যুরিষ্ট বাস চালু, রাস্তাঘাট উন্নয়ন ও স্থানীয়দের ইতিবাচক মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি পর্যটন শিল্প বিকাশে রাখতে পারে অনুকূল ভূমিকা। এ ক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগের সঙ্গে বেসরকারি উদ্যোগকেও উৎসাহিত করা যায়। প্রয়োজনে প্রণোদনা সুবিধা দিয়ে এ শিল্পকে করতে হবে আরও গতিশীল। তবেই পর্যটন ব্যবসায় আসবে বড় বিনিয়োগ, পাশাপাশি সম্প্রসারিত হবে বেকারদের কর্মসংস্থানের পরিধি এবং সর্বোপরি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে তৈরি হবে উর্বর ক্ষেত্র।

বিশিষ্ট উপজাতি নেতা (মারমা ডাইনেষ্টি) মংপ্রু চেীধুরী বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব সংস্কৃতির নান্দনিক রুপ, বৈচিত্রময় ভূ-প্রকৃতি, ইতিহাস প্রসিদ্ধ নিদর্শন গুলোর পরিচিতি ইত্যাদি বিষয়গুলো জনসমক্ষে বিশদভাবে তুলে ধরার ব্যাপারে পর্যটন কর্পোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগের জোড়ালো ভূমিকা দরকার। যদিও সবাই বলে প্রচারেই প্রসার কিন্তু বিভিন্ন গণমাধ্যমে পর্যটনবান্ধব পরিবেশের খবর প্রচারনায় আমরা অনেকটাই পিছিয়ে। তথ্য প্রযুক্তিকে বলা হয় এগিয়ে যাওয়ার শক্তি কিন্তু তথ্য আদান-প্রদান ব্যবস্থাপনায় রয়েছে মারাত্বক ক্রুটি বিচ্যুতি। এ সমস্যা উত্তরণে সংশ্লিষ্টদের হতে হবে আরও আন্তরিক ও চৌকষ। পর্যটন সংক্রান্ত খবরা খবর দ্রুত জনসমক্ষে নিয়ে আসতে হবে। গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরতে হবে ট্যুরিষ্ট স্পটগুলোর বিস্তারিত পরিচিতি এবং আসা-যাওয়া, থাকা-খাওয়াসহ পূর্নাঙ্গ বিবরণী।

১৯৯৭ সালের ২ডিসেম্বর সরকার ও জনসংহতি সমিতির মধ্যে সম্পাদিত পার্বত্য শান্তি চুক্তির পর পাহাড়ে অশান্তি এখন অনেকটাই কমেছে। তবে সমস্যা এখনও কিছু রয়ে গেছে, পাহাড়িদের আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-সংঘাতের কারণে প্রায়ই আইন-শৃঙ্খলার সার্বিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। এ সময় পর্যটকেরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। মাঝপথে নানা উদ্বেগ-উৎকন্ঠায় আটকা পড়েন ভ্রমনকারীরা। এ ধরনের উদ্বেগজনক
পরিস্থিতিতে ভ্রমনে নিরুৎসাহিত হয় তাঁরা। এখানে এ সমস্যাটি খুবই প্রকট। হরহামেশাই বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘষের্র খবর পাওয়া যায়। এই অনাকাঙ্খিত নেতীবাচক অবস্থার উন্নয়ন না ঘটলে পর্যটন শিল্পে আশানুরুপ উন্নয়ন সম্ভব নয়। পর্যটন এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন সর্বাগ্রে। পর্যাপ্ত ট্যুরিষ্ট পুলিশ চুরি, ছিনতাই ও ইভটিজারসহ নানা উপদ্রব-উৎপীড়ণ থেকে রক্ষা করবে পর্যটকদের। মানসিক প্রশান্তির মধ্যে নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় ভ্রমন চায় অনুসন্ধিৎসু মন। রাজনৈতিক অস্থিরতা পর্যটন শিল্পের জন্য বড় ধরনের বাধা। এ সময় দেশি-বিদেশী অতিথিরা ভ্রমনে নিরাপদ বোধ করেন না। এ জন্য প্রয়োজন স্থিতিশীল সুষ্ঠু রাজনৈতিক পরিবেশ। অবশ্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল গত ১৭, অক্টোবর রাঙ্গামাটিতে এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, পাহাড়ে অশান্তি সৃষ্টিকারীদের কঠোরভাবে দমন করা হবে।

বিশ্ব পর্যটন দিবসে প্রতিবছর বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন ও বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড প্রচারণামূলক বিভিন্ন কর্মসূচী গ্রহণ করে। রাজধানীতে বসে পর্যটন মেলা। এসময় দেশি-বিদেশি পর্যটন সংস্থাগুলো মেলায় অংশ নেয়। এর পরিধি বিভাগীয় কিংবা জেলা শহর পর্যন্ত বিস্তৃত হলে ব্যাপক জনগণের অংশগ্রহণে পর্যটন শিল্পকে আকর্ষনীয় ও লাভজনক বিনিয়োগে উৎসাহিত করা সম্ভব। এ বছর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পর্যটন দিবসের বাণীতে বলেছেন,“পর্যটন শিল্পে অধিকতর কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সংশ্লিষ্ট সেবা খাত গুলোতে দক্ষ জনবল তৈরি করে দেশের সার্বিক উন্নয়নে অবদান রাখার মাধ্যমে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গড়ে তুলব”।

পার্বত্য চট্টগ্রামের উল্লেখযোগ্য পর্যটন স্পটগুলোর কয়েকটি হলো, ৩৩৫ ফুট লম্বা রাঙ্গামাটির ঝুলন্ত ব্রিজ, শুভলং ঝর্ণা, কাপ্তাই লেক, উপজাতীয় যাদুঘর, রাজবন বিহার, চাকমা রাজবাড়ি, নৌ বাহিনীর পিকনিক স্পট, বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র, ইকো ভিলেজ প্রভৃতি। খাগড়াছড়িতে রয়েছে, আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্র, আলুটিলা গুহা, মানিকছড়ি মং রাজবাড়ি, মাটিরাঙ্গার শতবর্ষী বটগাছ, দেবতা পুকুর, বিজিবি স্মৃতিসৌধ, তৈদুছড়া, মায়াবিনী লেক, রামগড় চা বাগান, জেলা পরিষদ হর্টিকালচার পার্ক, রিছাং ঝর্ণা, হাতিমাথা পাহাড় প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। বান্দরবানে নীলগিরি পর্যটন স্পট, বোমাং রাজবাড়িসহ অসংখ্য দর্শনীয় স্থান রয়েছে।

রাঙ্গামাটির সাজেক ভ্যালি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৮০০ফুট উচ্চতায় অবস্থিত। ঢাকা থেকে দুরত্ব ৩৫০ কিলোমিটার। এখন পার্বত্য চট্টগ্রামের সবচেয়ে দর্শনীয় স্থান। ভারতের মিজোরাম সীমান্তে এর অবস্থান। এখানে প্রকৃতির তিন রুপ দৃশ্যমান গরমের মধ্যেই হঠাৎ বৃষ্টি আবার কখনও মেঘের চাদরে ঢাকা পড়ে পুরো উপত্যকা। এখানে আরও রয়েছে রুইলুই পাড়া,কংলাক পাড়া,কমলক ঝর্ণা প্রভৃতি চিত্তাকর্ষক আকর্ষণীয় স্থান।